ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ শীর্ষ নেতাদের এক মিনিটের মধ্যে হত্যার দাবি করেছে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী। দেশটির গণমাধ্যম চ্যানেল-১২-এর বরাত দিয়ে বিবিসি জানায়, গত শনিবার প্রথম আঘাত হানার এক মিনিটের মধ্যে তারা প্রাণ হারান। সশস্ত্র বাহিনী প্রধান, প্রতিরক্ষামন্ত্রী, বিপ্লবী গার্ড প্রধানসহ সব মিলিয়ে ৪০ জন নিহত হন।
সূত্রের বরাত দিয়ে গতকাল রোববার এনপিআর জানিয়েছে, গত শনিবার সকালে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সহযোগিতায় ইসরায়েল ওই হামলা চালিয়েছিল। এটাকে বড় ধরনের গোয়েন্দা সফলতা বলেই বর্ণনা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সামাজিক মাধ্যমে ট্রাম্প বলেন, খামেনি যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা ও নজরদারি এড়াতে পারেননি।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর ঠিক আগ মুহূর্তে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা বা সিআইএ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি অবস্থান সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করে। সেখানেই ছিলেন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। এ অভিযানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সিআইএ কয়েক মাস ধরে আয়াতুল্লাহ খামেনির ওপর নজর রাখছিল। তাঁর অবস্থান ও চলাচলের ধরন সম্পর্কেও তথ্য ছিল। এরপর সংস্থাটি জানতে পারে, শনিবার সকালে তেহরানের প্রাণকেন্দ্রে একটি সরকারি কম্পাউন্ডে শীর্ষ কর্মকর্তাদের বৈঠক হতে যাচ্ছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি ছিল– ওই বৈঠকে খামেনিও উপস্থিত থাকবেন।
নতুন এ গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের হামলার সময় পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়। তথ্যটি তারা উভয় দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রাথমিক বিজয় অর্জনের সুযোগ হিসেবে দেখে। কারণ, তাদের লক্ষ্যই ছিল শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তাদের নির্মূল এবং আয়াতুল্লাহ খামেনিকে হত্যা করা।
গত বছরের জুনে ১২ দিনের সংঘাতের পর থেকেই মূলত ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সর্বোচ্চ নেতার ওপর গোয়েন্দা নজরদারি জোরালো করে। গত শনিবারের হামলা তাদের লক্ষ্য যেমন পূরণ করেছে, তেমনি ইরানের ব্যর্থতাও তুলে ধরেছে। কারণ, প্রতিনিয়ত যুদ্ধ ও হত্যার হুমকি পাওয়ার পরও ইরানি কর্মকর্তারা যথেষ্ট নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলতে পারেননি। গোয়েন্দা তথ্য সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিদের মতে, সিআইএ আয়াতুল্লাহ খামেনির অবস্থান সম্পর্কে ‘হাই ফিডেলিটি’ বা অত্যন্ত নির্ভুল তথ্য দিয়েছিল ইসরায়েলকে।
ইসরায়েল মার্কিন ও নিজস্ব গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহার করে গত শনিবার ‘রোরিং লায়ন’ নামের অভিযান পরিচালনা করে। কয়েক মাস ধরে তারা এ অভিযানের পরিকল্পনা করছিল। মূলত, রাতের অন্ধকারে হামলা চালানোর পরিকল্পনা থাকলেও শনিবার সকালে তেহরানের সরকারি কম্পাউন্ডে বৈঠকের খবরের সুবিধা নিতে তারা সময় পরিবর্তন করে। সরকারি কমপাউন্ডে আছে ইরানের প্রেসিডেন্সি অফিস, সর্বোচ্চ নেতা ও ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের দপ্তর।
ইসরায়েলের স্থানীয় সময় অনুযায়ী গত শনিবার সকাল ৬টার দিকে অভিযান শুরু হয়। ওই সময় যুদ্ধবিমানগুলো ঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করে। হামলায় তুলনামূলক কম বিমান ব্যবহার হয়। কিন্তু যেগুলো ব্যবহার করা হয়, সেগুলো ছিল দূরপাল্লার ও অত্যন্ত নির্ভুল অস্ত্রে সজ্জিত। যুদ্ধবিমান উড্ডয়নের দুই ঘণ্টা পাঁচ মিনিট পর তেহরানের স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলো কম্পাউন্ডে আঘাত হানে। হামলার সময় জ্যেষ্ঠ জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারা কম্পাউন্ডের একটি ভবনে ছিলেন এবং খামেনি পার্শ্ববর্তী অন্য একটি ভবনে ছিলেন।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা কর্মকর্তার লেখা একটি বার্তা দেখার সুযোগ পেয়েছে। সেখানে লেখা, ‘শনিবার সকালের হামলাটি তেহরানের বেশ কয়েকটি স্থানে একই সঙ্গে চালানো হয়েছে। এর একটিতে ইরানের রাজনীতি ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট শীর্ষ ব্যক্তিরা একত্রিত হয়েছিলেন।’
আগে অনেকবার হত্যা চেষ্টা হয়েছিল
১৯৮১ সালের জুনে তেহরানের একটি মসজিদে খামেনির পাশে একটি টেপ রেকর্ডারের ভেতরে লুকানো বোমার বিস্ফোরণ ঘটনা ঘটে। তখন তিনি এ হত্যাচেষ্টা থেকে বেঁচে যান। ওই হামলার পর তিনি তাঁর ডান হাতের ব্যবহার হারিয়ে ফেলেন। পরে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি অনুভব করেছি যে, আল্লাহ আমাকে রক্ষা করছেন। আমাকে আরও ভারি দায়িত্বের জন্য রক্ষা করছেন।’
হত্যা প্রচেষ্টার চার মাস পর ৪১ বছর বয়সী খামেনি ৯৫ শতাংশ ভোটে ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৮৫ সালে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় তিনি ফের নির্বাচিত হন। ১৯৮৯ সালের ৩ জুন খোমেনির মৃত্যুর পরদিন তিনি ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা নিযুক্ত হন। খোমেনি নিজেই খামেনিকে তাঁর রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন।
