খুলনা, বাংলাদেশ
বুধবার । ৪ঠা মার্চ, ২০২৬ । ১৯ই ফাল্গুন, ১৪৩২
তোহফায়ে রমজানুল মোবারক জানতে ক্লিক করুন
  • Home  
  • রূপসায় কার্বন কোম্পানির বিষাক্ত ধোয়ায় স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ৮ গ্রামের মানুষ
- খুলনা

রূপসায় কার্বন কোম্পানির বিষাক্ত ধোয়ায় স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ৮ গ্রামের মানুষ

প্রতিনিয়ত কুণ্ডলি পাঁকানো কালো বিষাক্ত ধোয়ায় আচ্ছন্ন হচ্ছে রূপসার ৮ গ্রামসহ বিশাল পদ্ধবিলের ফসলের ক্ষেত ও মাছের ঘের। জনজীবনে স্বাস্থ্য ঝুঁকি বৃদ্ধির পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষকরা। ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে পরিবেশের। গত দু’দশক ধরে কৃষি, মৎস্য ও জনজীবনের ওপর চলছে এই নীরব দুর্যোগ। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘মিমকো কার্বন কোম্পানি লিমিটেড’ নামের একটি কারখানার কার্যক্রম শুরুর পর […]

প্রতিনিয়ত কুণ্ডলি পাঁকানো কালো বিষাক্ত ধোয়ায় আচ্ছন্ন হচ্ছে রূপসার ৮ গ্রামসহ বিশাল পদ্ধবিলের ফসলের ক্ষেত ও মাছের ঘের। জনজীবনে স্বাস্থ্য ঝুঁকি বৃদ্ধির পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষকরা। ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে পরিবেশের।

গত দু’দশক ধরে কৃষি, মৎস্য ও জনজীবনের ওপর চলছে এই নীরব দুর্যোগ। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘মিমকো কার্বন কোম্পানি লিমিটেড’ নামের একটি কারখানার কার্যক্রম শুরুর পর থেকেই বদলে গেছে পদ্মবিলসহ এ জনপদের চিত্র। ২০১৩ সালে জামালপুরের ইউসুফ মোল্লা পদ্মবিলের পাশে তিলক গ্রামে ৪৫ বিঘা জমির ওপর গড়ে তোলেন মিমকো কার্বন কোম্পানি। ওই বছরের মার্চ মাসে এর উদ্বোধন করেন তৎকালীন শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান। ঋণ খেলাপির দায়ে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে গেলে পরবর্তীতে বেসিক ব্যাংক থেকে লিজ নিয়ে পরিচালনা করছেন ওই এলাকার শাহজাহান শিকারি ও তার ভাতিজা মাসুম বিল্লাহ শিকারি।

ওই কোম্পানিতে ৪২টি চুলায় পাটকাঠি পুড়িয়ে কালি তৈরি করা হচ্ছে। আরও ১৮টি চুলা নির্মাণাধীন রয়েছে। এখানকার কালি রপ্তানি করা হয় চীনে। কিন্তু কালি তৈরি করতে গিয়ে পাটকাঠি পোড়ানোর কারণে কালো ধোয়ায় ঢেকে যাচ্ছে পদ্মবিল। এই ধোয়া বিস্তার লাভ করে তিলক, আমদাবাদ, মাছুয়াডাঙ্গা, নৈহাটী, দেবীপুর, সামন্তসেনা, পাথরঘাটা, গদাইখালি গ্রামে। এখান থেকে যে নির্গমন ধোঁয়া আধুনিক যন্ত্রপাতি বা ফিল্টার করার কেন ব্যবস্থা নেই।

রূপসা পদ্মবিলের আয়তন প্রায় ১৪০ হেক্টর। এর মধ্যে প্রায় ১১০ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ হয়। একসময় এই বিল থেকেই রূপসা উপজেলার কৃষি ও মৎস্যপণ্যের বড় অংশের জোগান আসত। কিন্তু এখন কার্বন কোম্পানির ধোয়ায় ফলন কমে যাওয়ায় কৃষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় অর্ধশতাধিক চুল্লি থেকে নির্গত বিষাক্ত কালো ধোঁয়া ও ছাইয়ে আচ্ছন্ন হয়ে থাকে আশপাশের কৃষিজমি, মাছের ঘের ও বসতভিটা। কারখানাটি উপজেলা পরিষদ থেকে মাত্র দুই থেকে তিন কিলোমিটার দূরে, সম্পূর্ণ কৃষিপ্রধান এলাকায় অবস্থিত। এক কিলোমিটারের মধ্যে অন্তত দশটির বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকলেও প্রশাসনের কার্যকর নজরদারির অভাব রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন, মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলন করেও তারা কোনো সমাধান পাননি। প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় প্রতিষ্ঠানটি টিকে আছে বলেও অভিযোগ ভুক্তভোগী গ্রামবাসীর।

তিলোক গ্রামের মরিয়ম বলেন- ‘হাঁপানি, কাশি ও হার্টের রোগীরা এই বিষাক্ত ধোয়ায় সীমাহীন কষ্টের মধ্যে রয়েছে। শিশুরা আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ছে। সন্ধ্যা হলে ওনারা ধোঁয়া ছেড়ে দেয়, সব চুলা জ¦ালিয়ে দেয়। কাশতে কাশতে মানুষ ক্লান্ত হয়ে যায়।’

স্থানীয় কৃষক গফফার শেখ বলেন- ‘কার্বন ফ্যাক্টরির কারণে আমাদের ধানের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। আগের মত ফলন পাচ্ছিনা। ধানগাছ মারা যাচ্ছে। টমেটো ও লাউসহ অন্যান্য ফলন কমে গেছে। ফুলগুলো ঝরে যাচ্ছে শুধু ওই ধোঁয়ার কালির কারণে। এই ছাই ঘেরেও পড়ে যে কারণে মাছ অক্সিজেন পায় না এবং বড়ো হতে পারেনা।’

কৃষক জুলফিকার আলী বলেন- ‘ধানের বাইল বের হওয়ার সময় ফুলগুলো ধোঁয়ায় নষ্ট হয়ে যায়। এলাকায় কেউ সুস্থ নেই, সব সর্দি-কাশি, জ্বর ও অ্যাজমায় ভুগছে। এই কোম্পানি অবৈধভাবে প্রশাসনকে অর্থ দিয়ে চালিয়ে আসছে।’

কৃষক আব্দুল বারিক বলেন- ‘মন্নুজান এসে উদ্বোধন করে গেলেন, কাগজপত্র নেই, তাহলে কীভাবে উদ্বোধন করলেন? আমরা গরিব মানুষ, আমাদেরই ভোগ করতে হচ্ছে।’

কৃষক মোঃ হাবিবুল্লাহ হাওলাদার বলেন- ‘কার্বনের ছাইয়ের কারণে পানির ওপর আবরণ পড়ে গেছে। আমরা মাছ চাষ করতে পারছি না। সব কালো হয়ে যাচ্ছে। সন্ধ্যায় এমন ধোঁয়া আসে থাকা যায় না। আমরা আন্দোলন করেছি, কিন্তু ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে।’

গৃহিণী সাজেদা বেগম বলেন- ‘ধোঁয়ায় খুব সমস্যা। রাতে ঘুমাতে পারি না। সব দিক থেকেই আমরা ক্ষতিগ্রস্ত।’

দিনমজুর রমেশ বলেন- ‘ধানের ফলন, গাছের ফলন সব কমে গেছে। বিশ্রী গন্ধে অধিকাংশ মানুষ শ্বাসকষ্টে ভুগছে।’

আমদাবাদ এলাকার শিক্ষক শাহজাহান বলেন- ‘স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও লোকালয়ের পাশে এ ধরনের কারখানা পরিবেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। আমরা মানববন্ধন, সাংবাদিক সম্মেলন করেছি, কিন্তু কোনো সুরাহা পাইনি।’

কারখানার নিকটে অবস্থিত আশরাফুল মাদারিস কওমি মাদ্রাসার হেফজ বিভাগের ছাত্র আব্দুল্লাহ ছানি বলেন- ‘কারখানার ধোঁয়া আমাদের হেফজখানা, কেরাতখানা, জামাতখানা সব জায়গায় ঢুকে পড়ে।’ কেরাত বিভাগের ছাত্র সাজিদ বলেন- ‘মাঝে মাঝে ধোঁয়ার পরিমাণ এত বেড়ে যায় যে সবাই কষ্ট পায়, কাশতে থাকে।’

মিমকো কার্বন ফ্যাক্টরির শেয়ার হোল্ডার মাসুম বিল্লাহ শিকারি বলেন- ‘এই ফ্যাক্টরির আদলে সারা দেশে ৫০টির ও বেশি ফ্যাক্টরি হচ্ছে। আমরাই প্রথম শুরু করি। এটা বাংলাদেশের কোনো প্রোডাক্ট না। এখান থেকে সম্পূর্ণটা চায়নায় রপ্তানি করা হয়।

ধোয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন- ‘চিমনিতে কানেকশন দিলে আগুনের সমস্যা হয়। তাই চুল্লির মুখ খুলে জ¦ালানো হয়। এটা ফাঁকা জায়গা তাই পরিবেশের ক্ষতি হয় না। বিশেষ করে আশেপাশের যত গাছগাছালি ও ধানের কোন ধরনের ক্ষতি বা সমস্যা নেই।’

উপজেলা কৃষি অফিসার তরুণ কুমার বালা বলেন, ‘অতিরিক্ত ধোঁয়া ও ফ্লাই অ্যাশের কারণে পলিনেশনে সমস্যা হচ্ছে, উপকারী পোকামাকড় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং সামগ্রিক কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কৃষকরা বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার অভিযোগ করছেন।’

পরিবেশ অধিদপ্তর, খুলনা জেলার সহকারী পরিচালক মোঃ হারুন অর রশিদ বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটি ২০১৩-১৪ সালে ছাড়পত্র পেলেও পরবর্তীতে পরিবেশগত শর্ত পূরণ না করায় পরবর্তীতে নবায়ন করা হয়নি। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে কিনা, তা সরেজমিন তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

খুলনা জেলা প্রশাসক আ. স. ম. জমশেদ খোন্দকার বলেন, ‘উপযুক্ত ফিল্টারিং ব্যবস্থা না থাকলে নির্গত ধোঁয়া বায়ু দূষণ ঘটাতে পারে এবং মৎস্য, কৃষি উৎপাদনসহ জনস্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। এই প্যারামিটারটি অবশ্যই গুরুত্বের সাথে নিতে হবে। অবশ্যই বিষয়টি খতিয়ে দেখব।’

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সম্পাদক ও প্রকাশক: মেহেদী কবীর সুমন

ইমেইল:  priyokhulna25@gmail.com 

যোগাযোগ:  ০১৭২৩৪৩৫৪৫০

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
©2025 priyokhulna all rights reserved