খুলনা বিভাগের ১০ জেলার ৩৬টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ২৫টিতে জয় পেয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বিপরীতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) পেয়েছে মাত্র ১১টি আসন। খুলনা বিভাগে এর আগে কখনো এত বেশি আসনে জামায়াত জয় পায়নি। সারা দেশে জামায়াতের মোট ৬৮টি আসনের প্রায় ৩৭ শতাংশই এসেছে এ বিভাগ থেকে।
বিভাগে সাতজন নারী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও কেউ জয় পাননি।
জেলা–ভিত্তিক চিত্র
বিএনপি সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েছে খুলনায়—৪টি। মাগুরায় ২টি এবং বাগেরহাট, যশোর, নড়াইল, ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়ায় ১টি করে। সাতক্ষীরা, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুরে কোনো আসন পায়নি দলটি।
অন্যদিকে জামায়াত মাগুরা ছাড়া সব জেলাতেই আসন পেয়েছে। যশোরে সর্বোচ্চ ৫টি, সাতক্ষীরায় ৪টি, বাগেরহাট, ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়ায় ৩টি করে; খুলনা, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুরে ২টি করে এবং নড়াইলে ১টি আসনে জয় পেয়েছে দলটি।
খুলনা বিভাগের প্রায় ৭০ শতাংশ আসনে জয় পেলেও দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার খুলনা-৫ আসনে পরাজিত হয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, তাঁর আসনে প্রায় ছয় হাজার ভোট বাতিল হয়েছে; বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ায় খতিয়ে দেখার কথা ভাবছেন তাঁরা।
কারণ কী দেখছেন বিশ্লেষকেরা
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) খুলনা জেলার সাধারণ সম্পাদক কুদরত-ই-খুদা মনে করেন, জামায়াতের সাংগঠনিক শক্তিমত্তা, তৃণমূল পর্যায়ে সক্রিয়তা এবং নারী কর্মীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ ফলাফলে বড় ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে ভারতবিরোধী মনোভাবের একটি অংশ জামায়াতের পক্ষে গেছে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি বলেন, নারীদের ঘরে ঘরে প্রচারণা, স্থানীয় ইস্যুতে সক্রিয় উপস্থিতি এবং নির্বাচনী কৌশলে ধারাবাহিকতা জামায়াতকে সুবিধা দিয়েছে।বিএনপির অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা
যশোর-৩ আসনে বিজয়ী ও বিএনপির খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, দলের এই বিপর্যয়ের কারণ খুঁজে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিক মনোনয়ন দেওয়ার পর প্রার্থী পরিবর্তন, মনোনয়নবঞ্চিত নেতাদের মাঠে সক্রিয় করতে না পারা এবং ধর্মভিত্তিক প্রচারের কৌশল মোকাবিলায় ব্যর্থতা—এসব বিষয় উঠে এসেছে প্রাথমিক আলোচনায়।
যশোরে পাঁচটি আসনের চারটিতে শেষ মুহূর্তে প্রার্থী বদলের প্রভাব পড়েছে বলে স্থানীয় নেতারা মনে করছেন। ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়ায়ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং সাংগঠনিক দুর্বলতা ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
সাতক্ষীরাকে বরাবরই জামায়াতের ঘাঁটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেখানে চারটি আসনেই জয় পেয়েছে দলটি। স্থানীয় বিএনপি নেতারা স্বীকার করেছেন, সাংগঠনিক দুর্বলতা ও প্রার্থী নির্বাচনে ত্রুটি ছিল।
চুয়াডাঙ্গায়ও প্রচারণায় দেরি এবং স্থানীয় নেতৃত্বের আচরণ ভোটে প্রভাব ফেলেছে বলে ভোটারদের একটি অংশ মনে করেন।
ভোটের পরিসংখ্যান
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যায়, বিভাগের ৩৬টি আসনে মোট ভোটকেন্দ্র ছিল ৫ হাজার ১৩৩টি। ভোটার সংখ্যা ১ কোটি ৪২ লাখ ৩৫ হাজার ৩৮৮ জন—এর মধ্যে পুরুষ ৭১ লাখ ২৩ হাজার ১৪০ এবং নারী ৭১ লাখ ১২ হাজার ১০৬ জন।
ভোটের হার ছিল—
খুলনা ও বাগেরহাটে প্রায় ৬৬%
নড়াইলে ৬৫% মাগুরায় ৭০% যশোরে ৭২% ঝিনাইদহে ৭১% চুয়াডাঙ্গায় ৭৬% কুষ্টিয়ায় ৬৭% মেহেরপুরে ৭৩%
বিভাগে বিএনপি ৩৬টি ও জামায়াত ৩৫টি আসনে প্রার্থী দেয়। খুলনা-৪ আসনটি জামায়াত খেলাফত মজলিসকে ছেড়ে দেয়।
খুলনা বিভাগে এই ফল রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে জামায়াতের সাংগঠনিক বিস্তার, অন্যদিকে বিএনপির প্রার্থী বাছাই ও তৃণমূল সমন্বয়ের ঘাটতি—দুইয়ের সমন্বিত প্রভাবেই এ চিত্র তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
